ভূমিকা
রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া এমন একটি অবস্থা যখন শরীরে প্রয়োজন এর তুলনায় পর্যাপ্ত পরিমাণ সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা বা হিমোগ্লোবিন না থাকে এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের অক্সিজেন পৌঁছানোর ক্ষমতা কমে যেতে পারে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে রক্ত শূন্যতা ধীরে ধীরে তৈরি হয় তাই শুরুতে বিষয়টি সহজে তে পারে। পরে দুর্বলতা মাথা ঘোরা ক্লান্তি ফ্যাকাসে ভাব বা শ্বাসকষ্ট যাওয়ার মত লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
রক্তশূন্যতার অন্যতম পরিচিত কারণ হল আয়রনের ঘাটতি হওয়া। তবে সকল ধরনের রক্তশূন্যতা আয়রনের অভাবে হয় না ভিটামিন বি১২ বা প্লেটের ঘাটে দীর্ঘদিনের কোন রোগ রক্তক্ষরণ বংশগত কিছু সমস্যা এবং অন্যান্য কারণেও এগুলা হতে পারে। তাই শুধু ঘরোয়া উপায়ের চিকিৎসা করার আগে রক্তশূন্যতার কারন ভালোভাবে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের এই লেখায় আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতার ক্ষেত্রে খাবার এবং দৈনন্দিন অভ্যাসের মাধ্যমে কিভাবে সহায়তা পাওয়া যাবে আবারো উপকারী এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরী তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো
রক্তশূন্যতার সাধারণ লক্ষণ
রক্তশূন্যতা অনেক কারণ হতে পারে রক্তশূন্যতার মাত্রা ও কারণ অনুযায়ী লক্ষণ হওয়াতে অনেকে বুঝতে সমস্যা হয়। সাধারণ কিছু লক্ষণগুলো হলো।
- সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়া
- শরীর অতিরিক্ত দুর্বল লাগা
- কারণ ছাড়াই মাথা ব্যাথা
- মাথা ঘুরানো
- মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া
- মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হওয়া
- অল্প পরিশ্রম করলে হাপিয়ে যাওয়া
- অল্পতেই বুক ধরফর করা।
- হাত-পা ঠান্ডা লাগা।
- স্বাভাবিক কাজেও অনেক বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়া।
রক্তশূন্যতার কারন
রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া হলো এমন একটি অবস্থা যখন শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ হিমোগ্লিপিন অথবা সুস্থলহিত রক্তকণিকা না থাকে, এর পিছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
রক্তশূন্যতার সাধারণ কারণগুলো
আয়রনের ঘাটতি, খাবারে পর্যাপ্ত আয়রন না থাকা রক্তশূন্যতার অন্যতম কারণ।
ভিটামিন বি১২ এর ঘাটতি, B12 কম থাকলে লোহিত রক্ত কণিকা তৈরিতে সমস্যা হয়।
অতিরিক্ত রক্তকরণ, মা বোনদের অতিরিক্ত মাসিক আঘাত ও শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণের কারণে হিমোগ্লোবিন কমে যেতে পারে।
পুষ্টির ঘাটতি, দীর্ঘদিন পর্যন্ত ও বৈচিত্র্যময় খাবার না খেলে শরীরে রক্তশূন্যতা হতে পারে।
বংশগত কারণ, থ্যালাসেমিয়ার মত কিছু বংশগত রক্তের সমস্যার কারণে এনিমিয়া হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি রোগ, কিছু কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগ রয়েছে যেগুলো সাথে অ্যানিমিয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে।
ফুলেটের ঘাটতি, শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণ ফুলেট না পেলে শরীরে এনিমিয়া হতে পারে।
গর্ব অবস্থায়, গর্ব অবস্থায় শরীরে আয়রন এবং অন্যান্য পুষ্টির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রক্তশূন্যতার ঝুঁকি বারতে পারে।
রক্তশূন্যতার কারন সবার ক্ষেত্রে একরকম হবে না তাই হিমোগ্লোবিন কম পাওয়া গেলে শুধু নিজে থেকে আয়রনের ওষুধ না কিনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করবেন।
রক্তশূন্যতা দূর করার ঘরোয়া উপায়
যদি রক্তশূন্যতার কারন খাদ্যে আয়রনের ঘাটতি হয় তাহলে প্রতিদিনের খাবারে আইরন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগ করতে হবে। who ও বৈচিত্র্যময় খাবার আয়রন যুক্ত খাবার এবং প্রয়োজনে স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহনের উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
রক্তশূন্যতা দূর করতে কী কী খাবার খাবেন
রক্তশূন্যতার ক্ষেত্রে খাবারের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পরিমাণ আয়রন পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। আইরন আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
খাবারের তালিকায় যা রাখতে পারেন
- ডাল
- মাছ
- মটরশুঁটি
- ডিম
- বাদাম
- ছোলা
- শাকসবজি
- শিমজাতীয় খাবার
- কিসমিস
- সুরবিহীন মাংস
- আয়রনসমৃদ্ধ শস্যজাত খাবার
হিমোগ্লোবিন কমে গেলে কী খাবেন?
হিমোগ্লোবিন কমে গেলে শরীরে ক্লান্তি দুর্বলতা মাথা ঘুরানো অথবা শ্বাসকষ্টের মত সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে আয়রনের ঘাটতি থাকলে খাবারের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পরিমাণ আয়রন পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
হিমোগ্লোবিন কমে গেলে খাদ্য তালিকায় যা রাখতে পারেন
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার
- কলিজা
- মাছ
- ডাল
- ছোলা
- শাকসবজি
- মটরশুটি
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার
- লেবু
- আমলকি
- পেয়ারা
- টমেটো
- কমলা
কোলেস্টেরল যুক্ত খাবার
পালং শাক অন্যান্য শাকসবজি ডাল ও শীমজাতীয় খাবার।
ভিটামিন বি১২ এর উৎস
- মাছ
- ডিম
- দুধ
- মাংস
আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে৷ সঙ্গে চা অথবা কফি না খাওয়াই বলো কারণ এগুলো আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে।
ডাল ও ছোলা নিয়মিত খাবারের রাখুন
শরীরে আয়রনের ঘাটতি পূরণে ডাল ও ছোলা ভালো একটি খাদ্য হতে পারে। এগুলোতে আইরন প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে। বিশেষ করে যারা কম মাংস খান তাদের জন্য দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় ডাল ষোলা মটরশুটি ও অন্যান্য সিম জাতীয় খাবার রাখতে পারেন।
দুপুরের খাবারে ভাত অথবা রুটির সঙ্গে ডাল খেতে পারেন। আবার নাস্তা অথবা বিকালের খাবার হিসেবে সিদ্ধ চুলের সালাত বা হালকা মসলা দিয়ে ছোলা খাওয়া যেতে পারে।
ডাল বা ছোলার সঙ্গে লেবু টমেটো অথবা পেয়ারার মতো ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার রাখলে উদ্ভিদ উৎস থেকে আয়রন শোষণে সহায়তা হতে পারে অন্যদিকে খাবারের সঙ্গে সঙ্গে চা অথবা কফি না খাওয়াই ভালো হবে।
তবে শুধুমাত্র ডাল ও ছোলা খেলে আয়রনের ঘাটতি সব সময় পূরণ হবে না দীর্ঘদিন হিমোগ্লোবিন কম থাকলে অথবা রক্তশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সবুজ শাকসবজি খান
শরীরে আয়রন এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করতে সবুজ শাকসবজি নিয়মিত খাবারের রাখা যেতে পারে। পালং শাক লাল শাক কলমি শাক পুঁইশাক সহ বিভিন্ন ধরনের শাখে আয়রন এবং ফুল এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে।
দুপুরে অথবা রাতের খাবারের সঙ্গে নিয়মিত পরিমাণে সাত খেতে পারেন টমেটো লেবু অথবা অন্যান্য ভিটামিন সি আবার রাখলে সেই খাবার থেকে আয়রন শোষণে সহায়তা করতে পারে।
তবে শুধুমাত্র শাক খেলেই যে রক্তশূন্যতা দূর হয়ে যাবে এমন নয়, ডাল চুলা মাছ ডিম মাংস সহ অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে সবুজ শাকসবজি মিলিয়ে সুষম খাদ্য তালিকা তৈরি করতে হবে। যদি আপনার হিমোগ্লিবেন দীর্ঘদিন ধরে কম থাকে তাহলে কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরী।
খাবারের সঙ্গে চা কফি না খাওয়াই ভালো
খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চা অথবা কফি পান করার অভ্যাস থাকলে শরীরে খাবার থেকে আয়রন শোষণ কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যাদের হিমোগ্লিবেন কম অথবা আয়রনের প্রচুর পরিমাণ ঘাটতি রয়েছে তাদের জন্য খাবারের সঙ্গে সঙ্গে চা অথবা কফি না খাওয়াই ভালো।
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার যেমন ডাল ছোলা শাকসবজি মাছ এবং মাংস খাওয়ার সময় চা কফির পরিবর্তে। ছা বা কফি খেতে চাইলে খাবারের কিছুটা সময় পড়ে খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
এভাবে খাবার থেকে আয়রন শোষণে বাধ্য কমানো এবং আয়রনের ঘাটতি পূরণে খাদ্যা অভ্যাস আর ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিম ও মাছ রাখুন খাবারের তালিকায়
মাছ ও ডিম শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন খনিজ উপাদানের ভালো উৎস। বিশেষ করে রক্ত তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে প্রতিদিনের খাবার তালিকায় পরিমিত পরিমাণে ডিম এবং মাছ রাখতে পারেন।
দুপুর অথবা রাতের খাবারের মাছ এবং সকালের নাস্তায় ডিম যোগ করতে পারেন মাছ এবং ডিমের সঙ্গে শাকসবজি সে সমৃদ্ধ ফল রাখলে খাবারে আরও বেশি পুষ্টিকর ও সুষম হবে।
তবে হিমোগ্লোবিন কমে গেলে শুধুমাত্র ডিম অথবা মাছ খাওয়াই যথেষ্ট হবে না আইরন, ভিটামিন বি১২, ফোলেট এর ঘাটতি থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
খেজুর ও কিসমিস খেতে পারেন
খেজুর ও কিসমিসে আয়রন সহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। তাই সুষম খাদ্য তালিকার অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে খেজুর ও কিসমিস খাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে বিকেল বেলা হালকা খাবার হিসেবে এগুলো সহজে রাখা যায়।
তবে শুধুমাত্র খেজুর অথবা কিসমিস খেলে রক্তশূন্যতা দূর হবে এমন কোন কথা নয়। আয়রনের ঘাটতি থাকলে শাকসবজি মাছ ডিম অথবা আয়রন যুক্ত এগুলা খাবেন আর দীর্ঘদিন হিমোগ্লোবিন কম থাকলে কারণ নির্ণয়ের জন্য একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।
রক্তশূন্যতা প্রতিরোধের দৈনন্দিন অভ্যাস
রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে প্রতিদিনের খাবার ও জীবন যাপনে কিছু সহজ পরিবর্তন করে নতুনভাবে অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত আয়রনসমৃদ্ধ খাবার যেমন চুলা শাকসবজি ডাল ডিম মাছ এবং মাংস খাবারের তালিকা রাখতে হবে।
আয়রন শরীরে ভালোভাবে শোষণের জন্য খাবারের সঙ্গে লেবু পেয়ারা কমলা অথবা টমেটোর মত ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খেতে পারেন।
এছাড়া প্রতিদিন পর্যাপ্ত ও বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়া পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমানো নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করা অতিরিক্ত রক্তকরন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার অভ্যাস করতে হবে। দীর্ঘদিন দুর্বলতা এবং মাথা ঘোরানো ফ্যাকশে দেখা গেলে রক্ত পরীক্ষা করে কারণ জানতে হবে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
রক্তশূন্যতার লক্ষণ যদি দীর্ঘদিন তাকে এবং দৈনন্দিন কাজে কর্মে সমস্যা হয় তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে অতিরিক্ত দুর্বলতা বারবার মাথা ঘুরানো শ্বাসকষ্ট বুকদরফর করা ত্বক ফ্যাকায়ে হয়ে যাওয়া এবং অজ্ঞান হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিলে অবহেলা করবেন না।
এছাড়াও অতিরিক্ত মাসিক রক্তপাত করুন বারবার হিমোগ্লিবেন কমে যাওয়া খাবার পরিবর্তনের পরও সমস্যা ভালো না হলে রক্ত পরীক্ষা করে কারো নির্ণয় করতে হবে।
নিজে থেকে দীর্ঘদিন আইরন ট্যাবলেট অথবা অন্য কোন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া নিরাপদ।
শেষ কথা
রক্তশূন্যতা দূর করার ঘরোয়া উপায় বলতে মূলত সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য উপস কে বোঝানো হয়েছে। খাবারে ছোলা ডাল শাকসবজি মাছ ডিম বাদাম বীজ সরবিহীন এবং অন্যান্য আয়রনসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল ও সবজি খেলে আয়রন শোষণে সহায়তা করতে পারে।
তবে সব সময় মনে রাখতে হবে রক্তশূন্যতা নিজে একটি রোগের নাম নয়। এটি বিভিন্ন কারনে হতে পারে। দীর্ঘদিন দুর্বলতা মাথা ঘোরা শ্বাসকষ্ট অস্বাভাবিক রক্তপাত অথবা বারবার এনিমিয়া হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।
খাবার দিয়ে পোস্টের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা ভালো কিন্তু প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী supplement অথবা অন্যান্য চিকিৎসা নিতে হবে।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য তত্ত্বের জন্য ব্যক্তিগত চিকিৎসা ও ওষুধের মাত্রা সাপ্লিমেন্ট শুরু করার সিদ্ধান্তের জন্য একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
