বিষাক্ত টক্সিক সম্পর্ক চেনার উপায়

একটি সুস্থ সম্পর্ক আমাদের এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে,জীবনে নিরাপত্তার অনুভূতি দেয় এবং কঠিন সময়ে বিশ্বাস ও সাহস জোগায়, প্রতিটা মানুষের জীবনে সম্পর্ক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সহকর্মী কিংবা জীবনসঙ্গী,  পরিবার অথবা  বন্ধু সব সম্পর্কই  আমাদের আত্মবিশ্বাস এবং সুখের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, ভালো সম্পর্ক আমাদের মানসিক শান্তির কারণ হয়ে থাকে।

কিন্তু সব সম্পর্কই ইতিবাচক হয় না, কিছু কিছু সম্পর্কের মাঝে শ্রদ্ধা, সম্মান আর ভালবাসার বদলে, ধীরে ধীরে তৈরি হয় সন্দেহ, ভয়, অবিশ্বাস, অমর্যাদা অবহেলা, আর মানসিক অশান্তি,

অনেকেই বছরের পর বছর এমন সম্পর্কে থেকে যান, সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, বিষাক্ত  সম্পর্ক গুলো আমরা অনেক সময় শুরুতে বুঝে উঠতে পারি না, প্রথম প্রথম ছোটখাটো বিষয়গুলো স্বাভাবিক মনে হলেও পরবর্তীতে সেগুলো নীতিগত  আচরণের বড় সমস্যায় পরিণত হয়।

আজকে এই আর্টিকেল থেকে আমরা জানবো বিষাক্ত সম্পর্ক কেমন হয়, লক্ষণ  কোন গুলো কি কি, এবং এর প্রতিকার কি।

বিষাক্ত সম্পর্ক আসলে কী?

বিষাক্ত সম্পর্ক নিয়ে কথা বলার আগে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্রতিটি সম্পর্কের মাঝেই বা ঝগড়া ঝাটি হতে পারে, তার মানে এই না যে সম্পর্কটা বিষাক্ত, বিষাক্ত সম্পর্ক হল এমন একটি সম্পর্ক যেখানে একজন  ব্যক্তি নিয়মিত এমন আচরণ করেন, যা অন্যজনের মানসিক শান্তি, আবেগ অনুভূতি এমনকি অসুস্থতার ওপর নীতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এমন সম্পর্কগুলোতে সাধারণত দেখা যায়, মিথ্যা বলা, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করা, মানসিক চাপ সৃষ্টি করা, অপরাধবোধ তৈরি করা, বিশ্বাসের সংকট, সম্মানের অভাব, বারবার অপমান এই বিষয়গুলো লক্ষ্য নিয়ে ভাবে বোঝা যায়,

মানুষের প্রত্যেকটা সম্পর্কের মাঝে মতের অমিল হতেই পারে, কিন্তু সুস্থ সম্পর্কে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন, কিন্তু অভিশপ্ত সম্পর্ক গুলোর মাঝে একি আচরণ বারবার ঘটে বরং তারও বেড়ে যায়।

সুস্থ সম্পর্ক বনাম বিষাক্ত সম্পর্কের মাঝে পার্থক্য কী?

সুসম্পর্কের মাঝে অনেকগুলা মূল্যবোধ থাকে, যেমন পারস্পরিক সম্মান, সমস্যা সমাধান এক সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি সম্মান, একে অপরের সাফল্যে আনন্দ লাভ করা, একজন অপরজনকে বিশ্বাস করা এবংখোলামেলা যোগাযোগ,

এর বিপরীত দিকে বিষাক্ত সম্পর্ক গুলোর মাঝে চলে, নিয়মিত অপমান, ভয় বা অপরাধবোধের সৃষ্টি করা, সন্দেহ, অবিশ্বাস, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণর করা,  মানুষিক চাপ সৃষ্টি, আত্মসম্মান নষ্ট করা, সব দোষ একজনের উপরে চাপিয়ে দেওয়া,

চলার পথে আমাদের জীবনে অনেকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়, আমাদেরকে অবশ্যই চেনা উচিত কোনটা বিষাক্ত সম্পর্কে এবং কোনটি সুস্থ সম্পর্ক,

বিষাক্ত সম্পর্ক গুলো প্রথমেই বুঝা যায় না, তাই অনেকেই মনে করেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, দীর্ঘদিনের এমন বিষাক্ত সম্পর্কে থাকলে এর প্রভাব গভীরভাবে আপনার জীবনে পড়তে পারে,

এতে করে আপনার দীর্ঘ মেয়াদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হতে পারে, আত্মবিশ্বাস কমে যায়, সব সময় উদ্বেগ কাজ করে, মানুষ তখন তার নিজের সিদ্ধান্তের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, এমনকি পরিবার বন্ধু বান্ধব সবার থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরে যাওয়া শুরু করে, তার ব্যক্তিগত জীবন কর্মজীবন এবং পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যেতে শুরু করে,

তাই যত দ্রুত সম্ভব সমস্যা গুলোকে চিহ্নিত করা তারপর তারপর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরী।

বিষাক্ত সম্পর্কে থাকা মানুষগুলো সব সময় নিজের কথাকেই সঠিক মনে করে, সে কখনোই আপনার কথা গুরুত্ব সহকারে শুনতে চাইবে না,এতে করে সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হয়, মতবিরোধ হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু বিষাক্ত সম্পর্ক থাকা মানুষগুলো কখনোই আলোচনা করতে চাইবে না, নিজের ভুলগুলো স্বীকার করে না, অন্যের অনুভূতিকে কোন গুরুত্ব দেন না।

সে কখনোই আপনার সাফল্যে খুশি হবে না, আপনার সফলতাকে আরো ছোট করে দেখবে, আপনার প্রশংসা না করে আপনার সমালোচনা করবে, আপনাকে অন্যের সাথে  তুলনা করবে, আপনার অর্জন গুলোকে সে কখনোই গুরুত্ব দেবে না,

সে বারবার সম্পর্ককে ভাঙার হুমকি দিবে, আপনার ব্যক্তিগত সীমা রেখাকে কখনোই সম্মান করবে না, এবং আপনার সঙ্গে বারবার মিথ্যা কথা বলবে, আপনার সিদ্ধান্তগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে,ভুল স্বীকার না  করে আপনাকেই বরং অপরাধী বানাবে, সে এমনভাবে কথা বলবে যেন আপনাকে সব সময় অপরাধ বোধে রাখা যায়, আপনি কখনোই এই সকল সম্পর্ক গুলোর মধ্যে নিজেকে নিরাপদ অনুভব করবেন না,

আপনি নিজেকে প্রশ্ন করুন

আমি কি এই সম্পর্ক গুলোর মধ্যে স্বস্তি অনুভব করি? ভুল করলে কি অতিরিক্ত উদ্বেগ হয়? তার কাছে নিজের কথাগুলো বলতে কি ভয় লাগে?

যদি আপনার উত্তর হ্যাঁ হয় তাহলে সম্পর্কটি নতুনভাবে মূল্যায়ন করা দরকার।

তবে মানুষ চাইলেই তার সাথে সম্পর্ক থেকে বের হতে পারে না, তার অনেকগুলো কারণ থাকে, সে মনে করে যদি সম্পর্ক এতটাই খারাপ হয় তাহলে মানুষ কেন থেকে যায়?

অনেকেই বিশ্বাস করেন একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে, তবে পরিবর্তনের আশা করা স্বাভাবিক, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে একই ক্ষতিকর  আচরণ চলতে থাকলে আপনার  বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। আবার অনেকেই মনে করেন এই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসলে আমি একা হয়ে যাব,এই কারণেও  মানুষ অস্বাস্থ্যকর সম্পর্কে কে টিকিয়ে রাখতে  চাই, কখনো কখনো পরিবার সমাজ পরিচিত মানুষের মতামতের কারণে মানুষ সম্পর্ক ছাড়তে দ্বিধাবোধ করেন,

বিষাক্ত সম্পর্ক গুলো যে সব সময় বিষাক্ততায় ভরা থাকে তেমন না, তার মাঝে অনেক ভালো স্মৃতি ভালো মুহূর্তও তাকে, কোন কোন মানুষ সেই স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে ধরে সব হয়তো আগের মত ঠিক হয়ে যাবে, এবং সে ওই সম্পর্কটা থেকে বের হতে পারেন না।

বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে বের হওয়ার উপায় ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো

আপনি যদি সত্যিই চান এই সম্পর্কটা থেকে বের হতে, আপনাকে অবশ্যই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে, অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে সম্পর্কটি আপনার জন্য ক্ষতিকর,

নিজের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন, যদি কোন কারণে আপনি ভয়  পান বা হুমকি দেয় অথবা শারীরিক কোন ক্ষতির আশঙ্কা অনুভব করেন তাহলে নিজের বিশ্বস্ত পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব, অথবা সংশ্লিষ্ট কোন সংস্থার সহায়তা নিতে পারেন।

বিষাক্ত সম্পর্কে তাকা মানুষগুলো আস্তে আস্তে অনেক বেশি একা হয়ে পড়ে, আপনার উচিত বিশ্বাসযোগ্য  মানুষের সঙ্গে কথা বলা, আপনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলুন, ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে বিষয়টি ভাগাভাগি করুন, আপনি চাইলে এমন কারো কাছে যেতে পারেন, যে মানুষটি আপনার বিচার না করে শুধু আপনার কথা শুনবে, এবং আপনাকে বুঝতে চেষ্টা করবে, কখনো কখনো শুধু নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারলো মানুষ মানসিকভাবে স্বস্তি পায়,

প্রয়োজনে নিজের সীমারেখা নির্ধারণ করুন, আপনি তার অসম্মানজনক ভাষা গুলোকে গ্রহণ করবেন না, নিজের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করুন নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অগ্রাধিকার বজায় রাখুন, কেউ যদি আপনার সীমারেখার বারবার অমান্য করেন,তাহলে সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করুন। প্রয়োজনের দূরত্ব তৈরি করুন, তবে পরিস্থিতি ভেদে ভিন্ন হতে পারে।

আপনার যদি এরকম টক্সিক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজন পড়ে,  তাহলে  কখনোই দোষারোপ করবেন না, সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরে অনেকেই ভেঙে পড়েন, নিজের ভিতরে অপরাধবোধ কাজ করে,

আমি বলব আপনি নিজেকে সময় দিন। নিজের পছন্দের কাজগুলো করুন, কারণ এই মুহূর্তে আপনাকে মানসিকভাবে সুস্থ হওয়া অনেক বেশি জরুরী, আপনি চাইলে বই পড়তে পারেন, নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য নতুন কিছু শিখুন, অথবা ভ্রমণে  বেরিয়ে যান,সবচেয়ে ভালো হয় যদি আপনি আপনার পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান, অভ্যাসগুলো আপনার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।

উপসংহার

সবশেষে এটাই বলব একই সুস্থ সম্পর্ক কখনোই, আপনার আত্মসম্মান, স্বাধীনতা অথবা মানসিক শান্তি কেড়ে নেবে না, এটি সত্যি কারের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হল, আন্তরিকতা, নিরাপত্তা,পারস্পরিক সহযোগিতা, বিশ্বাস  এবং সম্মান।

মনে রাখবেন নিজের মানসিক সুস্থতা এবং আত্মসম্মান রক্ষা করা কোন স্বার্থপরতা নয়, এটি একটি প্রয়োজনীয় দায়িত্ব, একটি সুস্থ সম্পর্ক আপনাকে বিকাশিত হতে সাহায্য করে, আর বিষাক্ত সম্পর্ক ধীরে ধীরে আপনাকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেই।

About admin

আমি মো: জারিফ হাসান একজন ছাত্র আমি লাইফস্টাইল নিয়ে লেখালেখি করতে পছন্দ করি

View all posts by admin →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *