স্মার্টফোনের নেশা থেকে মুক্তির কার্যকর উপায়

স্মার্টফোনের নেশা থেকে মুক্তির কার্যকর উপায়

স্মার্ট ফোন আজ আমাদের জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ, বর্তমান যুগে কে প্রযুক্তির যুগ বলা হয়, যোগাযোগ, পড়াশোনা, অফিসের কাজ, কেনাকাটা বিনোদন, সবকিছুই এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে করা সম্ভব। মোবাইল যেমন আমাদের জীবনকে সহজ ও আধুনিক করে দিয়েছে, তেমনি কিছু ক্ষতির কারণে হয়ে দাঁড়িয়েছে, অতিরিক্ত মোবাইল ফোনের আসক্তির কারণে অলসতা তৈরি হচ্ছে এবং দৈনন্দিন জীবনে কাজকর্মে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। প্রযুক্তির উন্নয়ন যেমন আমাদের জীবনকে সহজ করে দিয়েছে তেমনি,  অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণে তৈরি হয়েছে নতুন একটি সমস্যা তার নাম মোবাইল আশক্তি।

এই আর্টিকেল থেকে আমরা জানবো, মোবাইল আসক্তি কি, কেন এটি হয়, এবং কিভাবে সহজ ও কার্যকর উপায়ে এ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

মোবাইল আসক্তি কী?

মোবাইল জীবনের একটি অপরিহার্য ধ্বংস হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের, আমরা আমাদের দৈনন্দিন অনেক কাজ মোবাইলের মাধ্যমে করে থাকি,  যেমন পড়াশোনা, ব্যবসা, কেনাকাটা ইত্যাদি ইত্যাদি, যখন আমরা মোবাইল থেকে অতিরিক্ত ব্যবহার করি, এবং আমাদের  ঘুমের উপর নীতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে তখন সেটিকে মোবাইল আসক্তি বলা হয়।

এটি বর্তমানে পুরো সমাজ ব্যবস্থার উপরে এক বিরূপ প্রভাব ফেলেছে, শিশু থেকে বৃদ্ধ কিশোর ছাত্র-ছাত্রী  চাকরিজীবী ব্যবসায়ী এমনকি বয়স্ক মানুষদের মধ্যেও এই সমস্যা দ্রুত বাড়ছে।

মোবাইল আসক্তি বুঝার লক্ষণ।

চলুন মিলিয়ে নেয়া যাক আপনার সঙ্গে সেই আসক্তিগুলো মিলে কিনা, যদি মিলে তাহলে এখনি আপনার সতর্ক হয় সময় এসেছে।

  • পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিবর্তে ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকা।
  • প্রতিদিন পাঁচ থেকে আট ঘন্টা বা তারও বেশি সময় মোবাইল ব্যবহার করা।
  • খাবার খাওয়াই সময় ফোন ব্যবহার করা।
  • পড়াশোনা বা অন্যান্য যে কোন কাজ ফেলে রেখে মোবাইলে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা।
  • মোবাইল হাতের কাছে না থাকলে অস্থির বা বিরক্ত লাগা, মোবাইল আসক্তির কারণে অতিরিক্ত রাত জাগা ইত্যাদি।

এত সময় পর্যন্ত যদি আপনি আর্টিকেলটি পড়ে থাকেন, তাহলে জানতে পারলেন মোবাইল আসক্তি কি, চলুন এখন জেনে নেয়া যাক মানুষ কেন মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়ে।

স্মার্টফোনের বর্তমানে অনলাইনে অনেক ধরনের সোশ্যাল প্লাটফর্ম আছে, যেমন facebook instagram tiktok youtube shorts ইত্যাদি, এই সকল ফ্ল্যাট ফ্রম গুলোতে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন কনটেন্ট আসে এবং সেগুলোকে এমন ভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যা আপনাকে আকর্ষিত করে রাখে, আর এই আকর্ষণের কারণেই আপনি দীর্ঘ সময় একই প্লাটফর্মে থাকেন , একটি ভিডিও শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি ভিডিও চলে আসে ফলে সময়ের হিসাব হারিয়ে যায় খুব সহজেই। আর এভাবেই প্রতিনিয়ত আমাদের  মোবাইলের প্রতি আসক্ত হোক দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে।

একাকিত্বের প্রভাব।

বর্তমান যুগে অনলাইনে বা প্লাটফর্মে মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগ বাড়ালেও বাস্তবে মানুষের সাথে মানুষের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, মানুষ একাকি হয়ে পড়ছে, এবং একাকীত্ব সময় পার করার জন্য মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা স্ক্রল করে সময় পার করে।

তবে অনলাইন প্লাটফর্মে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা, ভিডিও দেখা, কিংবা অনলাইন গেম খেলা সাময়িকভাবে ভালো লাগলেও এটি আপনার আসক্তিতে  পরিণত হতে পারে।

অনলাইন গেম।

বর্তমানে অনলাইন গেমের জনপ্রিয় তা অনেক বেড়ে গেছে, একবার গেম শুরু করলে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বলতে বলতে ঘন্টার পর ঘন্টা পার হয়ে যায়, শুধু আমাদের যুব সমাজ নয়, শিশু থেকে বৃদ্ধ কম বেশি সবার এই গেমের প্রতি আসক্তি তৈরি হচ্ছে।

মানসিক চাপ কমানোর জন্য ফোন ইউজ করা।

অনেকে বাস্তব জীবনের চাপ থেকে স্মার্টফোন ব্যবহার করে থাকেন, মানুষ পরীক্ষার দুশ্চিন্তা, ব্যক্তিগত সমস্যা, পারিবারিক কলহ, থেকে বাঁচার জন্য বেশি বেশি সময় মিডিয়ায় কাটাতে শুরু করেন এভাবেই মোবাইল আর শক্তিতে পড়ে যান।

শর্ট ভিডিওর প্রতি নেশা।

বর্তমানে অনলাইন প্লাটফর্ম গুলোতে শর্ট  ভিডিও আপলোড করা হয়, এই শর্ট ভিডিও গুলো কে এমন ভাবে তৈরি করা হয়, যা দীর্ঘ সময় আপনার মনোযোগ আকর্ষিত করে একটির পরে  আরো একটি ভিডিও দেখার ইচ্ছা করে এবং সময় খুব দ্রুত চলে যায়।

অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে আমাদের শুধু সময় নষ্ট করে না, আমাদের জীবনযাত্রার বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যারা বারবার ফোন চেক করে তাদের দীর্ঘ সময় একটি কাজে মনযোগ ধরে রাখা কঠিন, তাদের  মনোযোগ একেবারেই কমে যায়।

শুধু তাই নয়, রাতে ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে , সেটি আমাদের অনেক বেশি ক্ষতি করে,  স্ক্রিনে  থাকা নীল আলো স্বাভাবিক ঘুমের  বাধা  সৃষ্টিকর্তে পারে, যার ফলে আমাদের ঘুম আসতে দেরি হয়, সকালে ক্লান্ত লাগে, এবং ঘুমের মান অনেক কমে যায়।

মোবাইল আসক্তি কমানোর কৌশল গুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো।

১ প্রতিদিন এর স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করা।

একদিনে বড় পরিবর্তনের চেষ্টা না করে ধাপে ধাপে এগুলোই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি,

অনেকেই মনে করেন সে দিনের কিছু সময় মোবাইল ব্যবহার করেছে, কিন্তু স্ক্রিন রিপোর্ট দেখলে বুঝা যায় অনেক সময় সেটি ৬ থেকে ৮ ঘন্টারও বেশি হয়।

আপনি যা করতে পারেন

  • প্রতিদিন স্কিন টাইম রিপোর্ট দেখুন।
  • ধীরে ধীরে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট করে কমানোর চেষ্টা করুন।
  • প্রথম সপ্তাহে আপনি যদি ৮ ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করেন তাহলে সেটি নামানোর চেষ্টা করুন পরে সপ্তাহে।
  • ফোন ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ঠিক করুন।

২ সকালে ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল ফোন হাতে নেবেন না।

অনেকে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে ঘুম ভাঙার পরে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করা শুরু করেন, এতে করে আপনার পুরো দিনের কাজের উপরে এর প্রভাব বিস্তার হয়।

  • আপনি বরং দিনের শুরুটা ৪০ থেকে ৬০ মিনিট এই কাজগুলো করতে পারেন।
  • নিজেকে ফ্রেশ করে নামাজ পড়ুন অথবা ধ্যান করুন।
  • ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটতে পারেন অথবা হালকা ব্যায়াম করতে পারেন।
  • আপনি চাইলে আপনার প্রিয় বইয়ের কয়েকটি পৃষ্ঠা পড়তে পারেন দিনের শুরুতে বই পড়লে মানুষের মন অনেক টাই হালকা থাকে।
  • আপনি ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস পানি পান করুন, সারাদিনের কাজকে আপনি প্রাণবন্ত করে তুলতে পারবেন।

শুরু করতে পারেন তাহলে আপনার মন অনেক বেশি সতেজ থাকবে।

৩ প্রয়োজনীয় এক মুছে ফেলা।

আমাদের স্মার্ট ফোনে প্রয়োজনীয় অ্যাপগুলা যেমন আমরা ব্যবহার করে থাকিতে তেমনি আমাদের ফোনে অনেক অপ্রয়োজনীয় অ্যাপস থাকে,

আপনি প্রশ্ন করুন এই অ্যাপসটি কি আমি সত্যিই ব্যবহার করি, যদি আপনার উত্তর না হয় তাহলে এখনি এই এপ্সটি আনইন্সটল করে দিন, কম অ্যাপস মানে কম বিভ্রান্তি।

৪ ঘুমানোর আগে মোবাইল দূরে রাখুন।

ঘুমানোর আগে, আপনি যখন আর পাঁচ মিনিট ফোন দেখবো বলে মোবাইল স্ক্রল করেন, তখন দেখা যায় দুই থেকে তিন ঘন্টা কেটে  যায়,চেষ্টা করুন,  ঘুমানোর অত্যন্ত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করা, মোবাইল বিছানার পাশে নয় টেবিলে রাখুন, এলার্ম  জন্য আলাদা ঘড়ি ব্যবহার করতে পারেন,

৫ নিজেকে পুরস্কৃত করুন,

ধরুন একটা আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আজকে থেকে ৩ ঘন্টা ফোন ব্যবহার করবেন না,

আপনি যদি এই কাজটি করতে পারেন তাহলে আপনি নিজেই নিজেকে পরিচিত করুন, এটি হতে পারে, একটি বই, প্রিয় কোন খাবার অথবা ভালো কোন সিনেমা দেখা,

উপসংহার

মোবাইল আসক্তি একদিনে তৈরি হয় না, আপনার প্রতিনিয়ত ব্যবহারেই এর মাত্রা বেড়ে যায়,তেমনি মোবাইল আসক্তি একদিনে দূর হয় না, নিয়মিত অনুশীলন এবং ছোট পরিবর্তন এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা যায়, আপনি যদি প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে, মোবাইল ব্যবহার কমাতে পারেন, তাহলে কয়েক মাসের মধ্যেই নিজের মধ্য ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করবেন।

 

About admin

আমি মো: জারিফ হাসান একজন ছাত্র আমি লাইফস্টাইল নিয়ে লেখালেখি করতে পছন্দ করি

View all posts by admin →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *