অনেক মানুষ মাসের শুরুতে ভালো পরিমান বেতন পেলেও মাসের শেষ হওয়ার আগেই অর্থ সংকটে পড়েন, আবার এমন অনেক মানুষ আছে যারা মনে করেন বেশি আয় না করতে পারলে সঞ্চয় করে সম্ভব নয়, কিন্তু ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল, কি করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভালো আর্থিক অভ্যাস তৈরি করা, বর্তমানে অত উপার্জান যতটা গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই অর্থ সঠিক ব্যবহার করা এবং ভবিষ্যতের জন্য কিছু অংশ সঞ্চয় করা,
জীবনে যে কোনো সময় টাকার প্রয়োজন হতে পারে, প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসার ক্ষেত্রে, অথবা চাকরি হারানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, কিংবা কোন ব্যবসা শুরু করা সুযোগ হতে পারে, এই পরিস্থিতিতে সঞ্চিত অর্থ সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে দাঁড়ায়।
এই আর্টিকেল থেকে আপনি জানতে পারবেন,কেন সঞ্চয় করা জরুরী, কেন৷ অনেকেই সঞ্চয় করতে পারে না, এবং কিভাবে সহজ কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে নিয়মিত টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব।
আপনি টাকা কেন সঞ্চয় করবেন ?
অনেকে মনে করেন, বর্তমানে তো আমার সব ঠিক আছে, ভবিষ্যতের চিন্তা পরে করা যাবে, কিন্তু আমাদের বুঝা উচিত ভবিষ্যৎ কখনো সুনিশ্চিত নয়, তাই অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয় করা অপরিহার্য।
টাকা সঞ্চয় করার মাধ্যমে আমরা বেশ কিছু পরিস্থিতি সামলে দিতে সামাল দিতে পারি যেমন,
জরুরী পরিস্থিতিতে সহায়তা:-আমাদের জীবনে যেকোনো সময় জরুরী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা চাকরি হারানো এবং ব্যবসায়ী লস, যখন আমাদের হাতে সঞ্চয় থাকে তখনই পরিস্থিতি গুলো আমরা খুব সহজেই সামল দিতে পারি।
মানসিক শান্তি :-সঞ্চিত অর্থ বা সম্পদ আমাদের মানসিক শান্তির অন্যতম কারণ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মানুষের ভিতরের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় ভবিষ্যতে অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগও কমে, এবং শ্রেণির বিগ নেতার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে এতে তার উন্নতির পথে বাধা প্রাপ্ত হয় না।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করা সহজ হয়ে যায়:-নিজের বাড়ি কেনা, ব্যবসা শুরু করা, উচ্চ শিক্ষা, সন্তানদের পড়াশোনা, অবসরের পরের জীবনে, জীবনের বিভিন্ন লক্ষ্য পূরণে সঞ্চয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঋণের উপর নির্ভরতা কমায়:-ব্যাংক লোন ডেবিট ক্রেডিট কার্ড লোন এসব আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চাপ সৃষ্টি করে, কিন্তু যাদের নিয়মিত সঞ্চয় থাকে, তাদের জরুরি প্রয়োজনে উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন অনেক কম হয়।
আপনি কি জানেন,কেন অনেক মানুষ সঞ্চয় করতে পারে না?
অনেকেই অপরিকল্পিতভাবে মাসে শুরু করেন, তারা ঠিক মতো বাজেট তৈরি করে না, যার কারণে কোথায় কত টাকা ব্যয় হচ্ছে তার কোন হিসাব থাকে না।
প্রতিমাসেই অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা আকর্ষণীয় অফার ডিসকাউন্ট নতুন ফোনের বিজ্ঞাপন থেকে আকর্ষিত হয়ে পড়ে, এবং এবং তাদের প্রয়োজন নেই এমন সব জিনিসপত্র কিনে ফেলেন।
বেতন বাড়লে অনেকে নতুন মোবাইলের দামি পোশাক বা বিলাসী জীবনযাত্রার বেশি অর্থ ব্যয় করে আয় বাড়লে ব্যায় ও বেড়ে যায় সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি হয় না।
আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট খরচ গুলোকে গুরুত্ব দেয় না, যেমন অতিরিক্ত চাককি অনলাইন subscription অপ্রয়োজনীয় খাবার, মাসে এসে এই ছোট ছোট খরচ গুলোই বড় অংকের অর্থে পরিণত হতে পারে।
অনেকে এই মাসের খরচের পর্যায়ে অংশটুকু বাকি থাকে তা দিয়ে সঞ্চয় করার মানসিকতা থাকে, কিন্তু এটা মোটেও ঠিক নয়,
আপনি যদি এই আর্টিকেলটা এত সময় ধরে পড়ে থাকেন, তাহলে জানতে পেরেছেন কি করে টাকার অপচয় হয়।
চলুন এখন জেনে নেয়া যাক, টাকা কিভাবে সঞ্চয় করতে হয়।
সঞ্চয় মূলত একটি অভ্যাস এটি একদিনে তৈরি হয় না, টাকাকে সঞ্চয় করতে হলে অবশ্যই আপনাকে করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে, আপনাকে প্রথমেই মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে, আপনি নিজেকে প্রশ্ন করুন-
- জরুরী পরিস্থিতিতে আমার হাতে কত টাকা থাকা উচিত?
- আগামী এক বছর আমার আর পিকলক কি কি হতে পারে?
- আমি টাকা কেন সঞ্চয় করতে চাই?
- আপনি যখন আপনার লক্ষ্য গুলো নির্ধারণ করবেন আপনার লক্ষ যখন পরিষ্কার থাকবে, তখন সঞ্চয় অনেক সহজ হয়ে যাবে।
১ মাসের প্রথমেই বাজেট তৈরি করুন
আপনি যদি আপনার অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করতে চান তাহলে বাজেটের কোন বিকল্প নেই, একটি বাজেটের সাধারণ বিষয়বস্ত নিচে উল্লেখ করা হলো
- মাসিক আয়,
- বাসা ভাড়া
- খাবারের খরচ
- যাতায়াত
- বিদ্যুৎ গ্যাস ইন্টারনেট বিভিন্ন ধরনের বিল
- শিক্ষা চিকিৎসা বিনোদন
- সঞ্চয়
আপনি যদি আপনার মাসিক সাধারণ অর্থনৈতিক বিষয় গুলো লিখে রাখেন তাহলে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন, আপনার কোন গুলো অপ্রয়োজনীয় খরচ হচ্ছে।
২ আপনি আপনার আর্থিক লক্ষ্য নির্ধারণ করুন
আপনি যে কোন একটি লক্ষ্য নির্বাচন করুন, লক্ষ ছাড়া সঞ্চয় করার আগ্রহ অনেক সময় কমে যায়, আপনার লক্ষ্য যত স্পষ্ট হবে সঞ্চয়ের অভ্যাস তত বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে, নিচে বেশ কয়েকটি লোকের উদাহরণ দেয়া হলো
আপনি চাইলে এটি মোটরসাইকেল কিনতে পারেন, আপনি চাইলে নতুন ব্যবসার জন্য যে করা শুরু করতে পারেন, অথবা বিদেশ ভ্রমণ, বাড়ি নির্মাণ,সন্তানের উচ্চ শিক্ষার জন্য অর্থ জমানো শুরু করতে পারেন।
অনেকে পাবেন মাত্র ৫০ বা ১০০ টাকা জমিয়ে কি হবে, ছোট অংকের সঞ্চয়কে অবহেলা করবেন না, প্রতিদিন মাত্র ১০০ টাকা সঞ্চয় করলেও, আপনার মাস শেষে ৩০০০ টাকা হবে যা বছরে হবে ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা, বাস্তবতা হলো ছোট ছোট সঞ্চয় একসময় বড় অংকে পরিণত হয়, কোন বোনাস, অতিরিক্ত আয়, বা উপহার হিসেবে পাওয়া অর্থের, একটি অংশ আপনার সঞ্চয়ে যোগ করুন।
মাসের শুরুতেই আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করে রাখুন, এরপর বাকি টাকা দিয়ে আপনি মাসের খরচ পরিচালনা করুন।এতে করে আপনার খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম হবে, আপনি বুঝতে পারবেন আপনি সঠিক জায়গায় ব্যয় করছেন কিনা, এই অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদির সঞ্চয় গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
অর্থ ব্যবস্থাপনা আর একটি জনপ্রিয় নীতি হলো “প্রথমে নিজেকে পরিশোধ করুন “
৩ অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা থেকে বিরত থাকুন, কেনাকাটা করার আগে একটি তালিকা তৈরি করুন, অনেক সময় আমরা প্রয়োজনের চেয়েও ইচ্ছার বশে বেশি কেনাকাটা করে ফেলি, কোন পণ্য কেনার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন এটা কি আমার জন্য জরুরী?একটি প্রশ্ন, আপনার অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দিতে পারে।
৪ আমরা ইন্টারনেটে স্ক্রল করি, বিভিন্ন প্লাটফর্মে শপিং এর উপর অফার, ডিসকাউন্ট, অনেক সময় আমাদের এমন পণ্য কিনতে উৎসাহিত, করে যেটা আসলে আমাদের কোন প্রয়োজন নেই, অফার নয় প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিন,মনে রাখবেন, অপ্রয়োজনীয় জিনিস অর্ধেক দামে কিনলেও সেটি সঞ্চয় নয় বরং অতিরিক্ত খরচ।
৫ কিছু ছোট ছোট অভ্যাস আমাদের মাসে সে ভালো পরিমাণ অর্থ সাতটায় করতে সাহায্য করতে পারে, যেমন অপ্রয়োজনীয় লাইট ফ্যান বন্ধ রাখা, রুম থেকে বের হওয়ার আগে এসি ফ্যান ও টিভি অফ করা, পানির অপচয় করা, প্রয়োজন ছাড়া গ্যাস লাইনের চুলা জালিয়ে না রাখা।
৬ শুধু নিজের সঞ্চয় করলে হবে না, পরিবারের সবাইকে সঞ্চয়ের অভ্যাস শেখান, পরিবারের সবাই মিলে মাসিক বাজেট নিয়ে আলোচনা করুন, যদি পরিবারের একজন সঞ্চয় করেন, আর অন্যরা খরচ করেন তাহলে ভালো ফল পাওয়া যাবে না,
সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই সঞ্চয়ের গুরুত্ব শেখান, লক্ষ্য ঠিক করে একসঙ্গে সবাই মিলে সঞ্চয় করুন, তাহলে সবাই সঞ্চয় প্রতি আগ্রহ হবে।
উপসংহার
প্রতি মাসে নিজের সঞ্চয় এর প্রতি এবং খরচের প্রতি খেয়াল করুন, তাহলে বুঝতে পারবেন আপনি কত টাকা আয় করেছেন এবং কত টাকা ব্যয় করেছেন, কোন কোন জায়গায় আপনার বেশি খরচ হয়েছে, আগামীতে কিভাবে আরো বেশি সঞ্চয় করতে পারবেন,
এই ছোট ছোট কৌশলগুলো হয়তো আপনাকে একদিনে এই ধনী করে তুলবে না, কিন্তু আপনি যদি নিয়মিত আপনার জীবনে এগুলার চর্চা করেন তাহলে, আপনার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে, অপ্রয়োজনীয় করা নিয়ন্ত্রণ ছোট সঞ্চয় এবং নিয়মিত পরিকল্পিত এর মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদের বড় আর্থিক পরিবর্তন আনতে পারবেন।
