চুল মানুষের সৌন্দর্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। ঘন, কালো, ও স্বাস্থ্যকর চুল দেখতে যেমন সুন্দর ঠিক তেমনি চুলের সুস্থতা এবং শরীরের সামগ্রিক পুষ্টি ও যত্নের সঙ্গে সম্পর্কিত। অনেকেরই চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে যায়, চুল আঁচড়ানোর সময় অনেক বেশি চুল উঠে আসে, চুল ভেঙ্গে যায়, কিংবা ধীরে ধীরে চুল পাতলা হতে শুরু করে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে চুলের গোড়া শক্ত করার ঘরোয়া উপায় কী।
চুলের গোড়া অথবা হেয়ার ফলিকলকে একদিনে শক্ত করার কোন জাদুকরি উপায় নেই, তবে সঠিক খাবার নিয়মিত পরিচর্যা পরিষ্কার রাখা অতিরিক্ত কেমিক্যাল ও তাপের ব্যবহার কমিয়ে রাখা এ যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করা যায়।
এই লেখাই চুলের গোড়া শক্ত করার ঘরোয়া উপায় চুল পড়ার সাধারণ কারণ এবং কোন খাবার চুলের জন্য উপকারী, তেল ব্যাবহারের সঠিক নিয়ম, এবং কোন ভুল গুলো এড়িয়ে চলবেন এই বিষয়ে সহজভাবে আলোচনা করা হলো।
চুলের গোড়া দুর্বল হওয়ার কারণ
চুলের গুড়া দুর্বল হওয়ার পিছনে অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে তেল না দেওয়ার কারণে চুল পড়ে এমন ধারনা অনেকে করেন এগুলো সঠিক নয়।
শোলপড়া বা চুল পাতলা হওয়ার সাধারণ কিছু কারণ রয়েছে যেগুলো হল।
- খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও পুষ্টির অভাব
- আয়রন বা কিছু পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি
- অতিরিক্ত মানসিক টেনশন
- পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমের অভাব
- হরমোনের পরিবর্তন
- অতিরিক্ত হিট ব্যবহার
- বংশগত কারণে চুল পাতলা হয়ে যাওয়া
- ভেজা চুলে জুড়ে আছড়ানো
- চুলে খুব শক্ত করে বাধা
- কিছু ওষুধ অথবা স্বাস্থ্যগত সমস্যা
- মাথার ত্বকে খুশকি
তাই চুল পরা যদি হঠাৎ করে বেড়ে যায় অথবা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে শুধু ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যবহার না করে বের করতে হবে অথবা একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
চুলের গোড়া শক্ত করার ঘরোয়া উপায় ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো।
নিয়মিত মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখুন
স্বাস্থ্যকর চুলের জন্য পরিষ্কার বা মাথার ত্বক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, মাথার ত্বকে অতিরিক্ত তেল, ধুলো, ঘাম ও মৃত কোষ জমে থাকলে অস্বস্তি খুশকি বা চুলকানি হতে পারে।
আমাদের চুলের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করে নিয়মিত মাথা পরিষ্কার করতে হবে। তবে প্রতিদিন অতিরিক্ত সেম্পু ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। চাঁদের স্ক্যাল্প বেশি তেলাতৈক্ত, তাদের তুলনামূলকভাবে বেশি ঘন ঘন চুল ধোয়ার প্রয়োজন হতে পারে। যখন শ্যাম্পু করবেন নখ দিয়ে জোরে ঘষার পরিবর্তে আঙ্গুলের ডগা দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করবেন।
নারকেল তেল ব্যাবহার করুন
নারকেল তেল চুলের পরিচর্যা বহুদিন ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে এটি চুলের শ্লোকতা কমাতে এবং চুলকে কন্ডিশন রাখতে সাহায্য করতে পারে।
ব্যবহারের সহজ পদ্ধতি হলো, পরিমাণ মতো নারকেল তেল নিয়ে চুলের গুড়া ও চুলের দৈর্ঘ্য আলতোভাবে লাগিয়ে কয়েক মিনিট হালকা মেসেজ করে কিছুক্ষণ রেখে শ্যাম্পু করে ফেলতে পারেন।
তবে আপনাকে মনে রাখতে হবে নারকেল তেল ব্যবহার করলে চুল পড়া বন্ধ হবে অথবা নতুন চুল গজানোর কোন নিশ্চয়তা নেই। এটি মূলত আপনার চুলের যত্নের একটি অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
চুলে অতিরিক্ত তেল জমিয়ে রাখবেন না
আমরা অনেকেই মনে করি যত বেশি তেল দেওয়া হবে তত বেশি শক্ত হবে কিন্তু বাস্তবে অতিরিক্ত তেল ব্যবহার সবার জন্য উপকারী নাও হতে পারে।
বিশেষ করে যাদের তৈলাক্ত বা খুশকির প্রবণতা রয়েছে তাদের অতিরিক্ত তেল ব্যবহার অস্বস্তি ও বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
তাই চুলের ধরন অনুযায়ী পরিমাণ মতো তেল ব্যবহার করতে হবে এবং দীর্ঘ সময় ধরে মাথায় তেল জমিয়ে রাখার পরিবর্তে প্রয়োজনমতো চুল পরিষ্কার রাখতে হবে।
খাবারের তালিকায় ডিম রাখুন
চুলের প্রধান উপাদান গুলোর মধ্যে একটি হলো ক্যারাটি নামের প্রোটিন তাই পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রোটিন পাওয়া চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ডিম একটি প্রোটিন সমৃদ্ধ একটি সহজলভ্য খাবার। পাশাপাশি এতে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। নিয়মিত সুষম খাবারের অংশ হিসেবে ডিম খেতে পারেন। তবে কোন একটি খাবারকে চুল পড়া বন্ধ করার একমাত্র সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
মাছ ও মাংস পরিমিত পরিমাণে খান
মাছ এবং মাংস প্রোটিনসহ বিভিন্ন পুষ্টির একটি উৎসব । যারা প্রাণিজ খাবার খান তারা সুষম খাদ্য তালিকায় মাছ ও পরিমিত পরিমাণে চরবিহীন মাংস রাখতে পারেন।
চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধুমাত্র তেল বা হেয়ার পেটের উপর নির্ভর না হয়ে শরীরের ভেতর থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ছোলা ও ডাল খান
যারা কম মাংস খান অথবা উদ্ভিদ খাবার বেশি গ্রহণ করেন তাদের জন্য ছোলা মটরশুটি ডাল ও অন্যান্য সিম জাতীয় খাবার গুরুত্বপূর্ণ। এসব খাবারে প্রোটিনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে, তাই প্রতিদিনের খাবারে ডাল অথবা অন্যান্য সিম জাতীয় খাবার রাখার চেষ্টা করতে হবে।
সবুজ শাক-সবজি খেতে হবে
সবুজ শাকসবজি আমাদের শরীরের জন্য বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন খনিজ ও অন্যান্য পুষ্টি সরবরাহ করে। বৈশাখ পালং শাক লাল শাক সহ বিভিন্ন সহ খাবারের তালিকায় রাখা যেতে পারে।
চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট খাবারের পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ফল প্রোটিন সিম জাতীয় শস্য মিলিয়ে সুষম খাবার খাওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফলমূল খান
বিভিন্ন ফল আমাদের শরীরকে ভিটামিন খনিজ ও অন্যান্য পুষ্ঠি দিতে পারে। কমলা পেয়ারা পেঁপে আমলকি কলা আপেলসহ মৌসুমী ফল খাদ্য তালিকা রাখতে পারেন। বিশেষ করে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করুন
পানি সরাসরি চুলের গোড়া শক্ত করে না তবে আমাদের শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃষ্ণা অনুযায়ী পানি পান করুন এবং গরুর মাপ হওয়া বা বেশি শারীরিক পরিশ্রমের সময় শরীরের পানির চাহিদা দেখে নজর রাখতে হবে।
চুলের গোড়া শক্ত করতে করণীয় কী
ভেজা চুলে জোড়ে আচড়াবেন না
ভেজা চুল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বঙ্গুর থাকে তাই গোসলের পর চুল বেঁচে থাকলে জুড়ে চিরুনি চালানো অথবা টানাটানি করা এড়িয়ে চলতে হবে চুল দূরে বসার পরিবর্তে আলতো ভাবে পানি শুষে নিতে হবে।
খুব শক্ত করে চুল বাঁধবেন না
প্রতিদিন শক্ত করে বেশি বা অন্য কোন স্টাইলে চুল বাধার অভ্যাস থাকলে পার্টি তো হবে কারণ চুলের উপর টান বেশি নরম হয়ে যাবে। চুল বাধার সময় অতিরিক্ত টানে এড়িয়ে চলতে হবে এবং মাঝে মাঝে চুল খোলা রাখতে হবে।
ঘন ঘন কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট করবেন না
শোলে বারবার কালার করা ব্লিচ স্টেট ট্রিটমেন্ট করলে চুলের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চুলের স্বাস্থ্য দুর্বল হলে এসব ট্রিটমেন্টের ব্যবহার কমিয়ে রাখা ভালো।
হেয়ার ট্রায়ার বাবা অন্যান্য হিট স্টাইলিং ব্যবহার করলে চুল ও মঙ্গল হয়ে যেতে পারে। ব্যবহার করার প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত তা এড়িয়ে চলতে হবে। সম্ভব হলে হিট প্রোডেট্কিং প্রোডাক্ট ব্যবহার করতে হবে।
চুল মজবুত করার উপায়
চুল মজবুত ও স্বাস্থ্যকর রাখতে শুধুমাত্র বাইরে থেকে যত্ন নিলেই হবে না, খাবার ও জীবন-যাপনের দিকেও নজর রাখতে হবে। আপনার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ডিম মাছ ডাল ছোলা শাকসবজি ফলমূল বাদাম এগুলো রাখতে হবে। এসব খাবার থেকে চুলের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়।
চুল ধোয়ার সময় নিজের চুলের ধরন অনুযায়ী শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হবে। চুলে তেল ব্যবহার করলে পরিমাণ মতো নারকেল তেল বা উপযুক্ত হেয়ার অয়েল দিয়ে হালকা হাতে মেসেজ করতে পারেন।
এছাড়া ব্যাচ আসলে জুড়ে চিরুনি দিয়ে আশ্রানু অতিরিক্ত হেয়ার টায়ার অথবা শক্ত করে চুল বাধার অভ্যাস এড়িয়ে চলতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণ মানুষিক চাপ নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে।
চুল বাড়ানোর খাবার
ফুল খুব দ্রুত লম্বা করার কোন নির্দিষ্ট খাবার নেই, তবে প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন, ও স্বাস্থ্যকর পেট সমৃদ্ধ সুষম খাবার স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
চুলের জন্য খাদ্য তালিকায় যে খাবারগুলো রাখতে পারেন।
- ডিম
- ডাল
- সবজি
- বাদাম
- কমলা
- দুধ
- মাংস
- পেয়ারা
- আমলকী
শুধুমাত্র একটি খাবারের উপর নির্ভর না করে প্রতিদিন সুষম খাবার খাওয়া চুলের জন্য ভালো অতিরিক্ত চুল পড়া বা চুল পাতলা হওয়ার সমস্যা থাকলে কারণটি খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরী প্রয়োজনে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
শেষ কথা
চুলের গোড়া শক্ত করার ঘরোয়া উপায় খুজলে প্রথমেই বুঝতে হবে চুলের স্বাস্থ্য ও ভালো রাখার জন্য কোন একক উপায় নেই। সুষম খাবার পর্যাপ্ত প্রোটিন শাকসবজি ফলমূল নিয়মিত মাথা পরিষ্কার রাখা চুলের উপর অতিরিক্ত চাপ ও রাসায়নিক ব্যবহার কমানো এসব অভ্যাস একসঙ্গে চুলের যত্নে ভূমিকা রাখতে পারে।
নারকেল তেল দিয়ে হালকা ম্যাসেজ বা অ্যালোভেরার মত ঘরোয়া উপাদান সাধারণ পরিচর্যার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে তবে এগুলোকে চুল পড়ার বিবেচনা করা যাবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চুল পড়ার কারণ খুঁজে বের করা। যদি হঠাৎ করে অতিরিক্ত চুল পড়া এবং দীর্ঘদিন ধরে রাসূল পাতলা হয়ে যাওয়া এবং টাকের দাগ তৈরি হওয়ার মত সমস্যা দেখা দেয় তাহলে গরু আর উপায় এর উপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
