পায়ের গোড়ালি ফেটে যাওয়া খুবই পরিচিত একটি সমস্যা। শীতকালে কিংবা আবহাওয়া শুষ্ক থাকলে অনেকের পায়ের গোড়ালিতে সাদা বা শক্ত চামড়া জমে যায় এবং ধীরে ধীরে সেখানে ছোট ছোট ফাটল তৈরি হয়। শুরুতে এই ফাটল তেমন কোনো সমস্যা তৈরি না করলেও সময়ের সঙ্গে এগুলো গভীর হয়ে ব্যথা, জ্বালাপোড়া এমনকি রক্তপাতের কারণ হতে পারে।
অনেকে মনে করেন, শুধু শীতের কারণেই পায়ের গোড়ালি ফাটে। আসলে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। ত্বকের অতিরিক্ত শুষ্কতা, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা, খালি পায়ে হাঁটা, অনুপযুক্ত জুতা, অতিরিক্ত গরম পানিতে পা ধোয়া, বয়স বাড়া, কিছু ত্বকের সমস্যা এবং নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক অবস্থার সঙ্গেও গোড়ালি ফাটার সম্পর্ক থাকতে পারে।
তবে ভালো খবর হলো—সঠিকভাবে যত্ন নিলে বেশিরভাগ সাধারণ ক্ষেত্রে গোড়ালির শুষ্কতা ও ফাটাভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব। এই লেখায় পায়ের গোড়ালি ফাটার সম্ভাব্য কারণ, ঘরে বসে যত্ন নেওয়ার নিয়ম, কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন—সবকিছু সহজভাবে আলোচনা করা হলো।
পায়ের গোড়ালি কেন ফেটে যায়?
পায়ের গোড়ালির ত্বক শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় অনেক বেশি চাপ সহ্য করে। হাঁটা, দাঁড়ানো এবং শরীরের ওজন বহনের সময় গোড়ালির ওপর নিয়মিত চাপ পড়ে। ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে গেলে এই চাপের কারণে শক্ত চামড়ায় ফাটল তৈরি হতে পারে।
নিচে গোড়ালি ফাটার কয়েকটি সাধারণ কারণ দেওয়া হলো।
১. ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যাওয়া
গোড়ালি ফাটার সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর একটি হলো ত্বকের শুষ্কতা। বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকলে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে যেতে পারে। ফলে গোড়ালির চামড়া শক্ত, রুক্ষ ও খসখসে হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে শীতের সময় এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। তবে শুধু শীতকালেই নয়, নিয়মিত গরম পানি ব্যবহার, কম পানি পান, অতিরিক্ত সাবান ব্যবহার বা ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা নষ্ট হওয়ার কারণেও গোড়ালি শুকিয়ে যেতে পারে।
২. দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা
যারা প্রতিদিন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করেন, তাদের পায়ের গোড়ালিতে শরীরের ওজনের চাপ বেশি পড়ে। এই অতিরিক্ত চাপ গোড়ালির চারপাশের ত্বককে বাইরে দিকে প্রসারিত করতে পারে।
ত্বক যদি একই সময়ে শুষ্ক ও শক্ত থাকে, তাহলে চাপের কারণে সেখানে ফাটল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
৩. খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাস
খালি পায়ে হাঁটলে পায়ের ত্বক সরাসরি ধুলো, মাটি ও বিভিন্ন শক্ত পৃষ্ঠের সংস্পর্শে আসে। এতে গোড়ালির ত্বক ধীরে ধীরে শক্ত ও রুক্ষ হতে পারে।
বাড়ির ভেতর পরিষ্কার মেঝেতে কিছুক্ষণ খালি পায়ে হাঁটা সাধারণত সমস্যা নয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় শক্ত মেঝে, রাস্তা বা শুকনো মাটিতে খালি পায়ে হাঁটলে গোড়ালিতে অতিরিক্ত চাপ ও ঘর্ষণ তৈরি হতে পারে।
৪. অনুপযুক্ত জুতা বা স্যান্ডেল
খুব শক্ত, ঢিলেঢালা বা গোড়ালি খোলা স্যান্ডেল ব্যবহারের কারণেও গোড়ালি ফাটতে পারে। বিশেষ করে এমন জুতা ব্যবহার করলে যেটিতে পায়ের গোড়ালি ভালোভাবে সাপোর্ট পায় না, হাঁটার সময় গোড়ালির ত্বকে চাপ ও ঘর্ষণ বাড়তে পারে।
তাই নিয়মিত ব্যবহারের জন্য আরামদায়ক ও পায়ের সঙ্গে মানানসই জুতা বা স্যান্ডেল বেছে নেওয়া ভালো।
৫. অতিরিক্ত গরম পানিতে পা ধোয়া
অনেকেই মনে করেন খুব গরম পানিতে পা ভিজিয়ে রাখলে পা পরিষ্কার ও আরামদায়ক হয়। কিন্তু অতিরিক্ত গরম পানি ত্বকের প্রাকৃতিক তেল কমিয়ে দিতে পারে।
ফলে পায়ের ত্বক আরও শুষ্ক হয়ে যেতে পারে এবং গোড়ালি ফাটার প্রবণতা বাড়তে পারে।
পা পরিষ্কার করার জন্য সাধারণত কুসুম গরম বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করাই ভালো।
৬. অতিরিক্ত সাবান ব্যবহার
শরীর পরিষ্কার রাখার জন্য সাবান প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত সাবান বা খুব শক্তিশালী ক্লিনজার ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমিয়ে দিতে পারে।
যাদের ত্বক এমনিতেই শুষ্ক, তাদের ক্ষেত্রে বারবার সাবান ব্যবহার করলে গোড়ালি আরও রুক্ষ হয়ে যেতে পারে।
৭. বয়স বাড়ার সঙ্গে ত্বকের পরিবর্তন
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ও নমনীয়তা কিছুটা কমে যেতে পারে। ফলে পায়ের ত্বক আগের তুলনায় বেশি শুষ্ক ও পাতলা হতে পারে।
এ কারণে বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে গোড়ালি ফাটার সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে।
৮. শরীরের অতিরিক্ত ওজন
শরীরের ওজন বেশি হলে পায়ের গোড়ালির ওপর প্রতিদিন বেশি চাপ পড়ে। হাঁটা বা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার সময় এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
যদি একই সঙ্গে গোড়ালির ত্বক শুষ্ক থাকে, তাহলে ফাটল তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
৯. কিছু ত্বকের সমস্যা
কিছু মানুষের গোড়ালি ফাটার পেছনে সাধারণ শুষ্কতার পরিবর্তে ত্বকের কোনো সমস্যা থাকতে পারে। যেমন একজিমা, সোরিয়াসিস বা অন্যান্য ডার্মাটাইটিসের কারণে পায়ের ত্বক শুষ্ক, মোটা ও খসখসে হতে পারে।
এ ধরনের ক্ষেত্রে শুধু ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলেই সবসময় সমস্যা পুরোপুরি ভালো নাও হতে পারে।
১০. ফাঙ্গাল সংক্রমণ
পায়ের আঙুলের ফাঁকে চুলকানি, সাদা বা খসখসে চামড়া, দুর্গন্ধ এবং একই সঙ্গে পায়ের ত্বক রুক্ষ হয়ে গেলে ফাঙ্গাল সংক্রমণের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হয়।
তবে শুধু গোড়ালি ফাটলেই ফাঙ্গাল ইনফেকশন হয়েছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সঠিক কারণ বোঝার জন্য প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
১১. ডায়াবেটিসসহ কিছু শারীরিক অবস্থা
কিছু দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যার সঙ্গে পায়ের ত্বকের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। ডায়াবেটিসে পায়ের যত্ন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্ষত বা ফাটল হলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।
ডায়াবেটিস থাকলে পায়ে গভীর ফাটল, ক্ষত, লালভাব, ফুলে যাওয়া বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
ঘরে বসে পায়ের গোড়ালির যত্ন কীভাবে করবেন?
সাধারণ শুষ্কতার কারণে গোড়ালি ফেটে গেলে নিয়মিত যত্ন অনেক উপকার করতে পারে। তবে নিয়ম মেনে যত্ন নেওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
১. প্রতিদিন পা পরিষ্কার রাখুন
প্রতিদিন পা পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। ধুলাবালি বা ঘাম জমে থাকলে পায়ের ত্বকে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
পা ধোয়ার পর পরিষ্কার তোয়ালে দিয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। বিশেষ করে আঙুলের ফাঁক যেন ভেজা না থাকে।
২. পা ধোয়ার পর ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন
গোড়ালি ফাটার ক্ষেত্রে নিয়মিত ময়েশ্চারাইজিং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যত্নগুলোর একটি।
পা ধোয়ার পর ত্বক পুরোপুরি শুকানোর কিছুক্ষণ পর গোড়ালিতে ঘন ময়েশ্চারাইজার লাগাতে পারেন। শুষ্ক ত্বকের জন্য তৈরি ফুট ক্রিম বা ঘন ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে।
যে পণ্য আপনার ত্বকে সহ্য হয় সেটিই নিয়মিত ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ।
৩. রাতে পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করতে পারেন
গোড়ালি খুব শুষ্ক হলে রাতে ঘুমানোর আগে পেট্রোলিয়াম জেলি বা অনুরূপ occlusive moisturizer পাতলা করে লাগানো যেতে পারে।
এরপর পরিষ্কার সুতির মোজা পরলে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তবে ফাটল যদি সংক্রমিত হয়ে থাকে, পুঁজ বের হয় বা জায়গাটি খুব ভেজা থাকে, তখন নিজের মতো করে শুধু কোনো পণ্য লাগিয়ে না রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
৪. শক্ত চামড়া আলতো করে পরিষ্কার করুন
গোড়ালিতে অতিরিক্ত শক্ত চামড়া জমে গেলে সেটি খুব আলতোভাবে ফুট ফাইল বা পিউমিস স্টোন দিয়ে পরিষ্কার করা যেতে পারে।
তবে এটি করার সময় জোরে ঘষা যাবে না। উদ্দেশ্য হলো অতিরিক্ত মৃত চামড়া ধীরে ধীরে কমানো, জীবন্ত ত্বক তুলে ফেলা নয়।
৫. ব্লেড দিয়ে চামড়া কাটবেন না
অনেকে গোড়ালির শক্ত চামড়া দেখে ব্লেড, ছুরি বা অন্য ধারালো বস্তু দিয়ে কেটে ফেলেন। এটি ঝুঁকিপূর্ণ।
এতে ত্বকে কাটা লেগে সংক্রমণ হতে পারে এবং ফাটল আরও খারাপ হতে পারে।
গোড়ালির শক্ত চামড়া কমাতে ধীরে ধীরে ময়েশ্চারাইজিং ও নিরাপদ ফুট ফাইল ব্যবহার করাই ভালো।
৬. খুব গরম পানিতে পা ভিজিয়ে রাখবেন না
কুসুম গরম পানিতে অল্প সময় পা ভিজিয়ে রাখা আরামদায়ক হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে গরম পানিতে পা ভিজিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই।
পা ভিজিয়ে নেওয়ার পর ভালোভাবে শুকিয়ে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
৭. আরামদায়ক জুতা ব্যবহার করুন
পায়ের গোড়ালি যাতে অতিরিক্ত চাপ না পায় সেদিকে খেয়াল করুন। জুতা বা স্যান্ডেল খুব শক্ত, খুব টাইট বা অতিরিক্ত ঢিলা হওয়া উচিত নয়।
দীর্ঘ সময় হাঁটা বা দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষেত্রে ভালো সাপোর্টযুক্ত আরামদায়ক জুতা ব্যবহার করা উপকারী।
৮. দীর্ঘ সময় খালি পায়ে হাঁটা কমান
বিশেষ করে শক্ত মেঝে, রাস্তা বা শুকনো মাটিতে দীর্ঘ সময় খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাস থাকলে তা কমানোর চেষ্টা করুন।
প্রয়োজনে নরম ও আরামদায়ক স্যান্ডেল ব্যবহার করতে পারেন।
গোড়ালি ফাটলে প্রতিদিনের সহজ রুটিন
পায়ের গোড়ালি ভালো রাখতে খুব জটিল কোনো রুটিনের প্রয়োজন নেই। নিয়মিত কয়েকটি অভ্যাসই যথেষ্ট হতে পারে।
সকালে
- পা পরিষ্কার রাখুন।
- আঙুলের ফাঁক শুকনো রাখুন।
- আরামদায়ক জুতা বা স্যান্ডেল পরুন।
- দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলে মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিন।
রাতে
- পা পরিষ্কার করে ভালোভাবে শুকিয়ে নিন।
- গোড়ালিতে ময়েশ্চারাইজার লাগান।
- খুব শুষ্ক হলে রাতে পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করতে পারেন।
- প্রয়োজনে পরিষ্কার সুতির মোজা পরুন।
এই রুটিন নিয়মিত অনুসরণ করলে সাধারণ শুষ্কতার কারণে হওয়া গোড়ালির ফাটাভাব ধীরে ধীরে কমতে পারে।
শীতকালে গোড়ালি ফাটা কমানোর উপায়
শীতকালে বাতাস শুষ্ক থাকায় ত্বকের আর্দ্রতা দ্রুত কমে যেতে পারে। তাই এ সময় পায়ের যত্ন একটু বাড়াতে হয়।
শীতের সময়—
- খুব গরম পানি ব্যবহার না করে কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন।
- পা ধোয়ার পর দ্রুত ময়েশ্চারাইজার লাগান।
- রাতে গোড়ালিতে ঘন ক্রিম বা পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করতে পারেন।
- খালি পায়ে বেশি হাঁটবেন না।
- পা ঢেকে রাখতে পরিষ্কার মোজা ব্যবহার করুন।
- গোড়ালি ফেটে গেলে নিয়মিত যত্ন নিন, গভীর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন না।
কোন ভুলগুলো গোড়ালির সমস্যা আরও বাড়াতে পারে?
অনেক সময় যত্ন নিতে গিয়ে কিছু ভুল অভ্যাসের কারণে সমস্যা আরও বেড়ে যায়।
অতিরিক্ত ঘষাঘষি
গোড়ালি নরম করার জন্য প্রতিদিন জোরে ঘষলে ত্বকে ক্ষতি হতে পারে।
ধারালো বস্তু দিয়ে চামড়া কাটা
এটি একেবারেই নিরাপদ পদ্ধতি নয়। বিশেষ করে ডায়াবেটিস থাকলে এমন কাজ করা উচিত নয়।
শুধু একদিন ক্রিম ব্যবহার করা
একদিন ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে ফল না পেলে বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়। শুষ্ক ত্বকের যত্নে নিয়মিততা গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত গরম পানি ব্যবহার
এটি সাময়িক আরাম দিতে পারে, কিন্তু ত্বকের শুষ্কতা বাড়াতে পারে।
ফাটা জায়গা অবহেলা করা
ছোট ফাটল শুরুতেই যত্ন নিলে বড় ফাটলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কমানো যায়।
গোড়ালি ফেটে রক্ত বের হলে কী করবেন?
গোড়ালির ফাটল গভীর হলে কখনো কখনো রক্তপাত হতে পারে। এমন হলে জায়গাটি পরিষ্কার পানি দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করুন এবং পরিষ্কার রাখুন।
বারবার ঘর্ষণ হয় এমন জুতা ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
যদি রক্তপাত বন্ধ না হয়, ক্ষত গভীর হয়, জায়গাটি লাল ও ফুলে যায়, পুঁজ বের হয় বা ব্যথা বাড়তে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
সব ধরনের গোড়ালি ফাটা ঘরে বসে চিকিৎসা করার বিষয় নয়। নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো—
- ফাটল খুব গভীর হয়ে গেছে
- হাঁটার সময় তীব্র ব্যথা হচ্ছে
- রক্তপাত হচ্ছে
- পুঁজ বা অন্য তরল বের হচ্ছে
- গোড়ালি অতিরিক্ত লাল বা ফুলে গেছে
- জ্বর এসেছে
- ক্ষত বারবার হচ্ছে
- কয়েক সপ্তাহ নিয়মিত যত্ন নেওয়ার পরও উন্নতি হচ্ছে না
- পায়ের ত্বকে ব্যাপক চুলকানি বা অন্য পরিবর্তন আছে
- আপনার ডায়াবেটিস আছে এবং পায়ে ফাটল বা ক্ষত হয়েছে
বিশেষ করে ডায়াবেটিস, রক্ত চলাচলের সমস্যা বা পায়ের অনুভূতি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে পায়ের ছোট ক্ষতকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
খাবারের সঙ্গে কি গোড়ালি ফাটার সম্পর্ক আছে?
সাধারণ গোড়ালি ফাটার সবচেয়ে বড় কারণ সাধারণত ত্বকের শুষ্কতা ও যান্ত্রিক চাপ। তবে শরীরের সামগ্রিক পুষ্টি ও স্বাস্থ্য ত্বকের অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি, ফলমূল এবং বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার রাখা ভালো।
শুধু একটি খাবার খেলে গোড়ালি ফাটা বন্ধ হয়ে যাবে—এমন কোনো সহজ সমাধান নেই। বরং সুষম খাবার, পর্যাপ্ত পানি, ত্বকের যত্ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা—সব মিলিয়েই ভালো ফল পাওয়া যায়।
গোড়ালি নরম রাখতে দীর্ঘমেয়াদি কিছু অভ্যাস
গোড়ালি একবার ভালো হয়ে গেলে আবার যাতে দ্রুত না ফাটে, সেজন্য কিছু অভ্যাস চালু রাখা দরকার।
১. প্রতিদিন পা পরিষ্কার রাখুন।
২. পা ধোয়ার পর ভালোভাবে শুকিয়ে নিন।
৩. নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
৪. খুব গরম পানি এড়িয়ে চলুন।
৫. দীর্ঘ সময় খালি পায়ে হাঁটা কমান।
৬. আরামদায়ক জুতা ব্যবহার করুন।
৭. গোড়ালিতে অতিরিক্ত শক্ত চামড়া জমতে দেবেন না।
৮. ধারালো কিছু দিয়ে চামড়া কাটবেন না।
৯. ফাটল দেখা দিলে শুরু থেকেই যত্ন নিন।
১০. অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রচলিত কিছু প্রশ্ন ও উত্তর
গোড়ালি ফাটলে কি প্রতিদিন পিউমিস স্টোন ব্যবহার করা যাবে?
প্রতিদিন জোরে ব্যবহার করা উচিত নয়। অতিরিক্ত ঘষাঘষিতে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী খুব আলতোভাবে ব্যবহার করা ভালো।
পেট্রোলিয়াম জেলি কি গোড়ালি নরম করতে সাহায্য করে?
হ্যাঁ, শুষ্ক ত্বকের ওপর পেট্রোলিয়াম জেলি আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। রাতে ব্যবহার করা অনেকের জন্য সুবিধাজনক।
গোড়ালি ফাটলে কি খালি পায়ে হাঁটা বন্ধ করা উচিত?
দীর্ঘ সময় শক্ত মেঝে বা রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটা কমানো ভালো। এতে গোড়ালির ওপর চাপ ও ঘর্ষণ কমতে পারে।
গোড়ালি ফাটার জন্য কি শুধু শীতই দায়ী?
না। শুষ্ক আবহাওয়া ছাড়াও দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা, অনুপযুক্ত জুতা, অতিরিক্ত গরম পানি, ত্বকের কিছু রোগ এবং অন্যান্য কারণ থাকতে পারে।
গোড়ালি ফাটার সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক আছে কি?
ডায়াবেটিসে পায়ের যত্ন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তবে গোড়ালি ফাটল মানেই ডায়াবেটিস আছে—এমন নয়। ডায়াবেটিস থাকলে পায়ের কোনো ক্ষত বা ফাটল অবহেলা করা উচিত নয়।
শেষ কথা
পায়ের গোড়ালি ফেটে যাওয়া অনেক সময় সাধারণ শুষ্কতা ও প্রতিদিনের চাপের কারণে হয়ে থাকে। শুরুতেই নিয়মিত যত্ন নিলে অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। পা পরিষ্কার রাখা, গোড়ালিতে নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার, অতিরিক্ত গরম পানি এড়িয়ে চলা, খালি পায়ে দীর্ঘ সময় না হাঁটা এবং আরামদায়ক জুতা ব্যবহার করা—এই সাধারণ অভ্যাসগুলো পায়ের ত্বক ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তবে গোড়ালির ফাটল যদি গভীর হয়, রক্ত বা পুঁজ বের হয়, তীব্র ব্যথা বা ফুলে যাওয়া দেখা দেয় কিংবা দীর্ঘদিনেও ভালো না হয়, তাহলে ঘরোয়া যত্নের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গোড়ালি ফেটে যাওয়ার পর শুধু সাময়িকভাবে ত্বক নরম করার চেষ্টা না করে নিয়মিত পায়ের যত্নের অভ্যাস তৈরি করা। প্রতিদিন কয়েক মিনিটের যত্নই ভবিষ্যতে বড় ধরনের অস্বস্তি থেকে পা বাঁচাতে পারে।
