গরমের দিনে বাইরে বের হলেই শরীরে ঘাম হওয়া খুবই স্বাভাবিক। একটু হাঁটাহাঁটি, খেলাধুলা, ব্যায়াম কিংবা শারীরিক পরিশ্রম করলেও ঘাম হতে পারে। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে তীব্র বা অস্বস্তিকর গন্ধ বের হয়। বিশেষ করে বগল, পায়ের পাতা, কুঁচকি এবং শরীরের ভাঁজে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।
শরীরের দুর্গন্ধ শুধু অস্বস্তির কারণ নয়, অনেক সময় এটি মানুষের আত্মবিশ্বাসেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারও সঙ্গে কথা বলা, অফিসে কাজ করা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া কিংবা গণপরিবহনে চলাচলের সময় নিজের শরীরের গন্ধ নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
তবে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—ঘাম নিজে সাধারণত দুর্গন্ধের প্রধান কারণ নয়। ত্বকে থাকা ব্যাকটেরিয়া যখন ঘামের কিছু উপাদান ভেঙে দেয়, তখন বিভিন্ন ধরনের গন্ধযুক্ত পদার্থ তৈরি হয়। মূলত সেখান থেকেই শরীরের পরিচিত দুর্গন্ধ তৈরি হয়।
এ ছাড়া গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, দীর্ঘ সময় ভেজা পোশাক পরে থাকা, অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা, কিছু খাবার, মানসিক চাপ এবং কিছু শারীরিক অবস্থাও শরীরের গন্ধ বাড়াতে পারে।
এই লেখায় আমরা জানব—ঘাম বেশি হলে দুর্গন্ধ কেন হয়, কোন অভ্যাসে গন্ধ বাড়ে, প্রতিদিন কীভাবে শরীরের যত্ন নিলে দুর্গন্ধ কমানো যায় এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ঘাম কী এবং কেন হয়?
ঘাম শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষামূলক একটি ব্যবস্থা। আমাদের শরীরের তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা প্রয়োজন। শরীর যখন অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়, তখন ঘামগ্রন্থি থেকে ঘাম বের হয়। ত্বকের ওপর থাকা এই তরল বাষ্পীভূত হওয়ার সময় শরীর কিছুটা ঠান্ডা হয়।
গরম আবহাওয়ায় ঘাম বেশি হওয়া স্বাভাবিক। একইভাবে দৌড়ানো, ব্যায়াম, খেলাধুলা, ভারী জিনিস বহন করা কিংবা দীর্ঘ সময় হাঁটার সময়ও ঘাম হতে পারে।
আবার শুধু গরমের কারণেই ঘাম হয় না। ভয়, উদ্বেগ, উত্তেজনা, রাগ কিংবা মানসিক চাপের সময়ও অনেকের হাতের তালু, পা ও বগলে বেশি ঘাম হয়।
তাই ঘাম হওয়া মানেই শরীরে কোনো সমস্যা আছে—এমন ধারণা ঠিক নয়।
ঘাম থেকে দুর্গন্ধ তৈরি হয় কীভাবে?
এখানেই মূল বিষয়টি বুঝতে হবে।
শরীর থেকে বের হওয়া সব ধরনের ঘামের গন্ধ একরকম নয়। ত্বকের বিভিন্ন ধরনের ঘামগ্রন্থি রয়েছে। বিশেষ করে বগল ও কুঁচকির মতো জায়গায় থাকা নির্দিষ্ট ঘামগ্রন্থির নিঃসরণে এমন কিছু উপাদান থাকতে পারে, যা ত্বকের ব্যাকটেরিয়া ভেঙে দেয়।
এই প্রক্রিয়ায় তৈরি বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের কারণে দুর্গন্ধ তৈরি হয়।
সহজভাবে বললে—
ঘাম + ত্বকের ব্যাকটেরিয়া + উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ = দুর্গন্ধের সম্ভাবনা বেশি।
এ কারণেই প্রচুর ঘাম হয় এমন একজনের শরীরে গন্ধ খুব কম হতে পারে, আবার অন্য একজন তুলনামূলক কম ঘামলেও তার শরীর থেকে বেশি গন্ধ আসতে পারে।
ঘাম বেশি হলে শরীরে দুর্গন্ধ হওয়ার সাধারণ কারণ
১. অতিরিক্ত ঘাম
যাদের শরীরে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঘাম হয়, তাদের ত্বক দীর্ঘ সময় ভেজা থাকতে পারে। বিশেষ করে বগল, পায়ের পাতা এবং শরীরের ভাঁজে ঘাম জমে থাকলে ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়।
ফলে সময়ের সঙ্গে শরীরের গন্ধ বাড়তে পারে।
কী করবেন?
ঘাম বেশি হলে শরীর শুকনো রাখার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে পোশাক পরিবর্তন করুন এবং গোসলের সময় ঘামপ্রবণ জায়গাগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করুন।
২. বগলে বেশি ঘাম হওয়া
বগল শরীরের এমন একটি জায়গা যেখানে ঘাম এবং ত্বকের ব্যাকটেরিয়ার কারণে সহজেই গন্ধ তৈরি হতে পারে।
বগলের ত্বক দীর্ঘ সময় ভেজা থাকলে গন্ধ আরও তীব্র হতে পারে।
করণীয়
প্রতিদিন বগল পরিষ্কার রাখুন। গোসলের পর ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। প্রয়োজন হলে উপযুক্ত ডিওডোরেন্ট বা অ্যান্টিপার্সপিরেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।
৩. দীর্ঘ সময় একই পোশাক পরে থাকা
একটি জামা সারাদিন পরে থাকলে শরীরের ঘাম, ত্বকের তেল এবং মৃত কোষ পোশাকে জমতে পারে।
বিশেষ করে ঘামে ভেজা জামা দীর্ঘ সময় পরে থাকলে দুর্গন্ধ দ্রুত বাড়ে।
করণীয়
ঘামে ভিজে গেলে যত দ্রুত সম্ভব পোশাক পরিবর্তন করুন। প্রতিদিন পরিষ্কার অন্তর্বাস ব্যবহার করুন।
ব্যায়াম বা খেলাধুলার পর ব্যবহৃত পোশাক দ্রুত ধুয়ে ফেলুন।
৪. পায়ের ঘাম ও দুর্গন্ধ
অনেকের পায়ের পাতায় প্রচুর ঘাম হয়। এরপর যদি দীর্ঘ সময় বন্ধ জুতা ও মোজা পরে থাকতে হয়, তাহলে জুতার ভেতরে উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ তৈরি হয়।
এতে ব্যাকটেরিয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে ছত্রাক বৃদ্ধির সুযোগ পেতে পারে। ফলে জুতা খোলার পর তীব্র দুর্গন্ধ পাওয়া যায়।
পায়ের যত্ন কীভাবে করবেন?
প্রতিদিন পা পরিষ্কার করুন। গোসলের পর বিশেষ করে আঙুলের মাঝের অংশ ভালোভাবে শুকিয়ে নিন।
প্রতিদিন পরিষ্কার মোজা ব্যবহার করুন এবং ঘামে ভেজা মোজা পরে থাকবেন না।
জুতা ব্যবহারের পর বাতাসে শুকানোর সুযোগ দিন।
৫. শরীর পরিষ্কার না রাখা
শরীরে ঘাম, তেল, মৃত কোষ ও বিভিন্ন জীবাণু জমে থাকলে দুর্গন্ধ বাড়তে পারে।
গরমের সময় দীর্ঘদিন গোসল না করা বা শরীরের ঘামপ্রবণ অংশগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার না করলে সমস্যাটি আরও বেশি হতে পারে।
করণীয়
নিয়মিত গোসল করুন। বগল, কুঁচকি, পায়ের পাতা, ঘাড় এবং শরীরের অন্যান্য ভাঁজ ভালোভাবে পরিষ্কার করুন।
তবে খুব শক্তভাবে ঘষে ত্বক পরিষ্কার করার দরকার নেই। অতিরিক্ত ঘষাঘষি করলে ত্বকে জ্বালা বা শুষ্কতা তৈরি হতে পারে।
৬. সিনথেটিক ও আঁটসাঁট পোশাক
কিছু সিনথেটিক কাপড় শরীরের ঘাম সহজে শোষণ করতে পারে না। ফলে ত্বকের ওপর আর্দ্রতা আটকে থাকে।
আবার খুব আঁটসাঁট পোশাক পরলে বাতাস চলাচল কম হয়। এর ফলে শরীরের কিছু অংশ দীর্ঘ সময় গরম ও ভেজা থাকতে পারে।
করণীয়
গরমের দিনে আরামদায়ক ও বাতাস চলাচল করতে পারে এমন পোশাক পরুন। ঘামে ভিজে গেলে পোশাক পরিবর্তন করুন।
৭. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক চাপের সময় অতিরিক্ত ঘাম হয়। পরীক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, জনসমক্ষে কথা বলা, ভয় বা উদ্বেগের সময় বগল ও হাতের তালুতে বেশি ঘাম হতে পারে।
এই ঘামও শরীরের গন্ধে ভূমিকা রাখতে পারে।
করণীয়
নিয়মিত ঘুম, হাঁটাহাঁটি, ব্যায়াম এবং বিশ্রামের অভ্যাস করুন। অতিরিক্ত মানসিক চাপ থাকলে সেটি নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজে বের করা জরুরি।
৮. কিছু খাবার শরীরের গন্ধে প্রভাব ফেলতে পারে
খাবারের প্রভাব সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঝাল ও মসলাযুক্ত খাবার ঘাম বাড়াতে পারে।
রসুন, পেঁয়াজসহ কিছু তীব্র গন্ধযুক্ত খাবারের উপাদান শরীরের গন্ধেও প্রভাব ফেলতে পারে।
কী করবেন?
কোন খাবার খাওয়ার পর আপনার ঘাম বা শরীরের গন্ধ বেড়ে যায় তা লক্ষ্য করুন। প্রয়োজন হলে সেই খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেখতে পারেন।
৯. হরমোনের পরিবর্তন
শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের সময় ঘামের পরিমাণ ও গন্ধে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
বয়ঃসন্ধিকাল, কিছু হরমোনজনিত পরিবর্তন এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থায় ঘাম বেশি হতে পারে।
এ ধরনের পরিবর্তন যদি দীর্ঘদিন থাকে বা অন্যান্য উপসর্গের সঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
প্রতিদিন শরীরের দুর্গন্ধ কমানোর নিয়ম
শরীরের দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণে কোনো একটি উপায় সবার জন্য একইভাবে কাজ করবে না। তবে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও সঠিক অভ্যাস অনেকটাই সাহায্য করতে পারে।
প্রতিদিন গোসল করুন
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় নিয়মিত গোসল শরীর পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
বিশেষ করে বগল, কুঁচকি, পা এবং শরীরের ভাঁজ পরিষ্কার রাখুন।
গোসলের পর শরীর ভালোভাবে শুকিয়ে নিন
গোসলের পর শরীর ভেজা রেখে পোশাক পরলে শরীরের কিছু অংশ দীর্ঘ সময় আর্দ্র থাকতে পারে।
বগল, পায়ের আঙুলের ফাঁক এবং শরীরের ভাঁজ ভালোভাবে শুকিয়ে নিন।
পরিষ্কার পোশাক পরুন
প্রতিদিন পরিষ্কার জামা ও অন্তর্বাস ব্যবহার করুন।
ঘামে ভেজা পোশাক দীর্ঘ সময় পরে থাকবেন না।
মোজা প্রতিদিন পরিবর্তন করুন
পায়ে বেশি ঘাম হলে একই মোজা দ্বিতীয় দিন ব্যবহার না করাই ভালো।
মোজা ধুয়ে সম্পূর্ণ শুকিয়ে তারপর ব্যবহার করুন।
জুতা শুকনো রাখুন
ব্যবহারের পর জুতাকে বাতাসে শুকানোর সুযোগ দিন।
একই জুতা প্রতিদিন টানা ব্যবহার না করে সম্ভব হলে পালাক্রমে ব্যবহার করুন।
ডিওডোরেন্ট ও অ্যান্টিপার্সপিরেন্ট কি একই?
না, দুটির কাজ এক নয়।
ডিওডোরেন্ট মূলত শরীরের গন্ধ নিয়ন্ত্রণ বা ঢাকতে সাহায্য করে।
অন্যদিকে অ্যান্টিপার্সপিরেন্ট নির্দিষ্ট উপাদানের মাধ্যমে ঘামের পরিমাণ সাময়িকভাবে কমাতে সাহায্য করতে পারে।
যাদের অতিরিক্ত ঘামের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অ্যান্টিপার্সপিরেন্ট কিছুটা বেশি উপকারী হতে পারে।
তবে যেকোনো পণ্য ব্যবহারের আগে লেবেলের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
নতুন পণ্য ব্যবহারের পর যদি ত্বকে জ্বালা, লালচে ভাব, চুলকানি বা র্যাশ দেখা দেয়, তাহলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করুন।
শরীরের দুর্গন্ধ দূর করতে লেবু বা বেকিং সোডা ব্যবহার করা উচিত?
অনলাইনে অনেক সময় লেবু, বেকিং সোডা, ভিনেগারসহ বিভিন্ন উপাদান বগলে ব্যবহার করার পরামর্শ দেখা যায়।
কিন্তু এসব উপাদান সরাসরি ত্বকে ব্যবহার করলে সবার ক্ষেত্রে নিরাপদ নাও হতে পারে। বিশেষ করে সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালা, শুষ্কতা বা র্যাশ তৈরি হতে পারে।
তাই শুধু ইন্টারনেটে কোনো ঘরোয়া টিপস দেখে সরাসরি ত্বকে প্রয়োগ না করাই ভালো।
নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য ব্যবহার করাই ভালো পদ্ধতি।
খাবার ও পানির দিকে নজর দিন
শরীরের সুস্থতার জন্য সুষম খাবার গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত শাকসবজি, ফল, প্রয়োজনীয় প্রোটিন এবং পর্যাপ্ত পানি গ্রহণের অভ্যাস করুন।
অতিরিক্ত ঝাল বা মসলাযুক্ত খাবার খেলে যদি আপনার ঘাম বাড়ে, তাহলে সেগুলোর পরিমাণ কমিয়ে দেখুন।
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাসও কমানো ভালো।
ব্যায়াম করলে দুর্গন্ধ কেন বাড়তে পারে?
ব্যায়ামের সময় শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে এবং ঘাম বেশি হয়। তাই ব্যায়ামের সময় দুর্গন্ধ সাময়িকভাবে বেশি হতে পারে।
এটি স্বাভাবিক।
সমস্যা হয় যখন ব্যায়ামের পরও দীর্ঘ সময় ঘামে ভেজা পোশাক পরে থাকা হয়।
ব্যায়ামের পর করণীয়
ব্যায়াম শেষ করার পর যত দ্রুত সম্ভব ঘামে ভেজা পোশাক পরিবর্তন করুন। সম্ভব হলে গোসল করুন।
পরিষ্কার তোয়ালে ব্যবহার করুন এবং ব্যায়ামের পোশাক নিয়মিত ধুয়ে ফেলুন।
রাতে ঘাম হলে কী করবেন?
কিছু মানুষের রাতে ঘাম হতে পারে। গরম আবহাওয়া বা বেশি ভারী পোশাকের কারণে সামান্য ঘাম হওয়া স্বাভাবিক।
তবে নিয়মিত এমনভাবে রাতের ঘাম হলে যে জামা বা বিছানা ভিজে যায়, বিষয়টি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত—বিশেষ করে যদি এর সঙ্গে জ্বর, অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার মতো অন্য লক্ষণ থাকে।
অতিরিক্ত ঘাম কি কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে?
অনেক সময় অতিরিক্ত ঘাম সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এটি কোনো শারীরিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
যেমন কিছু হরমোনজনিত সমস্যা, নির্দিষ্ট সংক্রমণ, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা অতিরিক্ত ঘামের বিশেষ সমস্যা।
তাই যদি আগে এমন না থাকলেও হঠাৎ ঘাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?
শরীরের দুর্গন্ধের পাশাপাশি নিচের লক্ষণগুলো থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
- হঠাৎ অতিরিক্ত ঘাম শুরু হওয়া
- কোনো কারণ ছাড়াই দীর্ঘদিন ঘাম বেশি হওয়া
- ঘুমের মধ্যে নিয়মিত প্রচুর ঘাম হওয়া
- শরীরের গন্ধে হঠাৎ বড় ধরনের পরিবর্তন
- ত্বকে ঘা, র্যাশ বা বারবার সংক্রমণ হওয়া
- ঘামের কারণে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হওয়া
- অতিরিক্ত ঘামের সঙ্গে দুর্বলতা বা অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকা
বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি বা তীব্র অসুস্থতার সঙ্গে হঠাৎ অতিরিক্ত ঘাম হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
একটি সহজ দৈনিক পরিচ্ছন্নতার রুটিন
শরীরের দুর্গন্ধ কমাতে প্রতিদিনের রুটিনকে সহজভাবে সাজানো যায়।
সকালে
ঘুম থেকে উঠে শরীর পরিষ্কার করুন। বগল, পা এবং শরীরের অন্যান্য ঘামপ্রবণ জায়গা ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে নিন।
এরপর পরিষ্কার পোশাক ও অন্তর্বাস পরুন।
প্রয়োজনে উপযুক্ত ডিওডোরেন্ট বা অ্যান্টিপার্সপিরেন্ট ব্যবহার করতে পারেন।
দিনের মধ্যে
অনেক বেশি ঘাম হলে সম্ভব হলে পোশাক পরিবর্তন করুন।
পানি পান করুন।
বাইরে দীর্ঘ সময় থাকলে শরীরের ঘাম ও পোশাকের অবস্থা খেয়াল করুন।
ব্যায়ামের পর
ঘামে ভেজা পোশাক দ্রুত পরিবর্তন করুন।
সম্ভব হলে গোসল করুন।
মোজা ও জুতা শুকানোর ব্যবস্থা করুন।
রাতে
ঘুমানোর আগে শরীর পরিষ্কার রাখুন।
বগল ও পা শুকনো রাখুন।
পরিষ্কার ও আরামদায়ক পোশাক পরুন।
শরীরের গন্ধ কমাতে যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
অনেকেই দুর্গন্ধ কমানোর জন্য একসঙ্গে অনেক ধরনের সুগন্ধি বা স্প্রে ব্যবহার করেন। এতে আসল সমস্যা সমাধান না হয়ে শুধু কিছু সময়ের জন্য গন্ধ ঢেকে যেতে পারে।
আরেকটি ভুল হলো ঘামে ভেজা পোশাকের ওপর সরাসরি পারফিউম স্প্রে করা। এতে ঘাম ও শরীরের গন্ধের সঙ্গে সুগন্ধি মিশে আরও অস্বস্তিকর গন্ধ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত সাবান দিয়ে বারবার শরীর ঘষে পরিষ্কার করাও ঠিক নয়। এতে ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষা বাধাগ্রস্ত হয়ে শুষ্কতা ও জ্বালা হতে পারে।
শরীরের দুর্গন্ধ নিয়ে লজ্জা পাওয়ার প্রয়োজন নেই
শরীরের গন্ধ নিয়ে অনেকেই বিব্রত হন। কিন্তু মনে রাখা দরকার, ঘাম হওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া।
কারও শরীরে বেশি ঘাম হতে পারে, কারও কম। কারও ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার ধরন বা পরিমাণের কারণে গন্ধ বেশি হতে পারে।
তাই এই সমস্যাকে লজ্জার বিষয় না বানিয়ে পরিচ্ছন্নতা ও প্রয়োজনীয় যত্নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা উচিত।
যদি নিয়মিত যত্ন নেওয়ার পরও সমস্যা থেকে যায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
শেষ কথা
ঘাম শরীরের স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় একটি প্রক্রিয়া। শরীরকে ঠান্ডা রাখতে এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই ঘাম হওয়া বন্ধ করা নয়, বরং অতিরিক্ত ঘাম ও ঘামের কারণে তৈরি হওয়া দুর্গন্ধকে নিয়ন্ত্রণ করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
শরীরের দুর্গন্ধের পেছনে শুধু অপরিচ্ছন্নতা দায়ী নয়। অতিরিক্ত ঘাম, ত্বকের ব্যাকটেরিয়া, গরম ও আর্দ্র পরিবেশ, ভেজা পোশাক, বন্ধ জুতা, মানসিক চাপ, কিছু খাবার এবং কিছু শারীরিক কারণও ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিদিন গোসল করা, বগল ও পা পরিষ্কার রাখা, শরীর ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া, পরিষ্কার পোশাক ও মোজা ব্যবহার করা, জুতা শুকনো রাখা এবং ঘামে ভেজা পোশাক দ্রুত পরিবর্তন করার মতো ছোট ছোট অভ্যাস শরীরের দুর্গন্ধ অনেকটাই কমাতে পারে।
আর যদি অতিরিক্ত ঘাম হঠাৎ শুরু হয়, রাতে অস্বাভাবিকভাবে ঘাম হয়, শরীরের গন্ধে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয় অথবা অন্য কোনো শারীরিক উপসর্গের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘাম থাকে, তাহলে শুধু ডিওডোরেন্ট ব্যবহার করে বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
নিজের শরীরের পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলাই সুস্থ ও স্বস্তিদায়ক জীবনযাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
